,

অস্তিত্বহীন মিলের নামেও দেয়া হয় বরাদ্দ

টিচার ডেস্ক  – চাল কলের অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ধুলাবালির আস্তরন পড়ে পরিত্যক্ত ওইসব চালকল। অথচ ওইসব চালকলের নামেও দেয়া হয় চালের বরাদ্দ। শুধু তাই নয়, খাদ্য বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারীর নামেও ঢুকছে গুদামে চাল। আর এতে করে ওইসব মিল মালিক ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের চেহারা বিদ্যুৎ গতিতে যাচ্ছে পাল্টে। চাল সরবরাহ ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় অনেক খাদ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর শেকড় গজিয়েছে। অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েও নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননা।
কুষ্টিয়া খাদ্য গুদামের মনাক্কা ছিলেন পিয়ন। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হয়েছেন। পোষ্টিংও হয়েছেন হালসা খাদ্য গুদামে। কিন্তু সেখানে যোগদান না করে আঁকড়ে রয়েছে খাদ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে। কথিত রয়েছে তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে রয়েছেন এই কার্যালয়ে।

শহরের হরিশংকরপুর এলাকায় অবস্থিত বিসমিল্লাহ রাইস মিল। কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এটি। সেখানে এখন পেরেক তৈরির কারখানা করা হয়েছে। সামনে বিক্রি করা হয় ভুসিমাল। মিলের মালিক আসলাম শেখের ছেলে ভুসিমালের ব্যবসা করেন। মিলটি অচল থাকলেও সচল ও চালু দেখিয়ে এ মিলের লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি গোডাউনে চাল দিচ্ছেন অফিসের কর্মচারী সালেহা খাতুন।

কবুরহাট কদম তলা এলাকার আমিরুল রাইস মিল বন্ধ রয়েছে ৭/৮ বছর। অথচ এই মিলের নামে বরাদ্দ দেয়া হয় চাল। একই এলাকার ভাটা রাইস মিলও বন্ধ রয়েছে বছর দশেক। সেই মিলের মালিক সোবহান আলী মারা যাওয়ার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে। অথচ এই মিলও বরাদ্দের তালিকায়।
খাজানগরের এফএম বজলুর রহমানের মালিকানাধীন সন্দুরবন রাইস মিল বিক্রি হয়ে গেছে বহু আগে। একই অবস্থা ভেড়ামারা রাইস মিলও। অথচ ওইসব রাইস মিলের নামে বরাদ্দ নিয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

যদিও ওই দুই মিলের কথিত স্বত্ত্বাধিকারীর দাবী বিষয়টি আদৌ সত্য নয়। কথিত ওইসব মিলের মালিক অস্বীকার করলেও সরেজমিনে তাদের মিলের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মিল মালিক আসলাম জানান, লোকসানের কারণে তিনি মিল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন এ জায়গা ভাড়া দিয়েছেন। সামনে ছেলে ভুসিমালের ব্যবসা করে। ব্যাংকে অনেক টাকা দেনা। তবে মিলের লাইসেন্সটি ব্যবহার করেন খাদ্য অফিসের কর্মচারী সালেহা খাতুন। প্রতি বছর তার উদ্যোগেই মিল থেকে গোডাউনে চাল সরবরাহ করা হয়। আমার কাছে চেক সই করাতে আসেন। তবে আমাকে কোনো টাকা-পয়সা দেন না।

বারখাদা এলাকার অবস্থিত বারখাদা রাইস মিলের মালিক গোলাম সরোয়ার হোসেন। মিলটি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বেশ কয়েক বছর। অথচ এ মিলের অনুকূলে প্রতি বছর চাল সরবরাহে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। মিলের এ লাইসেন্সে সরকারি গোডাউনে চাল সরবরাহ করছেন সালেহা খাতুন। ২৫ বছর ধরে একই অফিসে চাকরির সুবাদে সাহেলা জড়িয়ে পড়েছেন চাল সরবরাহের কাজে।

সালেহা খাতুন বলেন, আমি ছোট চাকরি করি। তাই অন্যের লাইসেন্সে কিছু চাল সরবরাহ করি। তবে এতে খুব বেশি লাভ হয় না।

গত বোরো মৌসুমের মতো এ বছরও ইতিমধ্যে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ওইসব মিলের লাইসেন্সের অনুকূলে চাল বরাদ্দ পাচ্ছেন। এ মাসেই এসব চাল সরবরাহ করবেন তারা। প্রতিটি মিলের অনুকূলে ৬ থেকে ১৬ টন পর্যন্ত চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। শুধু সালেহা খাতুনই নয়, খাদ্য অফিসের ৫ থেকে ৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী এ কাজে জড়িত। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ের অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গুদামপ্রধানরাও অবৈধ এ কারবার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতি বছর। সিন্ডিকেট করে তারা প্রতি বছর বিভিন্ন মিলের নামে চাল সরবরাহ করে আসছেন।

শুধু খাদ্য অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, গুটি কয়েক মিল মালিক একেকজন ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি গোডাউনে চাল সরবরাহ করছেন। এমনকি যার একটি মিলও নেই এমন ব্যবসায়ী ১০ থেকে ১৫টি মিলের অনুকূলে চাল সরবরাহ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এসব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে মিলারদের মাঝে।

খাদ্য অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফিরোজুর রহমান ৫ বছর ধরে চাকরি করছেন। তিনি ওহাব রাইস মিলসহ বেশ কয়েকটি মিলের লাইসেন্স ব্যবহার করে চাল সরবরাহ করছেন। মিল মালিকদের অভিযোগ, ফিরোজুর রহমানের কাছে জিম্মি সব মিল মালিক। ফাইল আটকে রেখে তিনি অর্থ আদায় করেন।

অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজুর রহমান বলেন, যে অভিযোগ করা হয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই। চাল সরবরাহের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

জেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি তার জানা নেই। সরকারি চাকরি করে চাল সরবরাহ করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


     এই বিভাগের আরো খবর