,

ক্রসফায়ারই মাদকদ্রব্য নির্মূলের একমাত্র পন্থা হতে পারে না

বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই মাদক সর্বগ্রাসি রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে আমাদের যুব সমাজ যারা আগামী দিনে আমাদের দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করবে, রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে সেইসব কোমলমতি যুব সমাজের অধিকাংশ আজ মারাত্মক মাদক সেবন করে নিজেদের ধ্বংস করছে। জাতির আভ্যন্তরিন শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিভিন্নস্তরের এক শ্রেণীর অসৎ মানুষ অর্থের লোভে এসব মারাত্মক ও ক্ষতিকারক মাদকদ্রব্যের ব্যবসার সাথে জড়িত।

বর্তমান প্রশাসন হঠাৎ করে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে প্রতিদিনই ১০/২০ জন মানুষকে বন্দুকযুদ্ধের দেখিয়ে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করছে। এটা সবাই জানে আমাদের দেশের সমতল ভূমিতে যেখানে পাহাড়-জঙ্গল নেই, পাশাপাশি আমাদের দেশের নিরাপত্তা বাহিনী অতি আধুনিক হওয়ার ফলে বন্দুকযুদ্ধে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি প্রদর্শিত ভাঙ্গা পিস্তল আর ঐ ধরণের নিম্নমানের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এটা বিশ্বাস করার কোন কারন নেই।

অপরদিকে এটা সবাই জানে সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি আছে যারা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় মাদকদ্রব্য ব্যবসার মুল ভূমিকা পালন করছে। পুলিশ বাহিনীর এক শ্রেণীর অসাধু পুলিশ সদস্যের সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এ মদক ব্যবসায়ীদের অর্থের লোভে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি এসব প্রভাবশালী ও অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। অধিকাংশ মাদকদ্রব্য ভারত এবং মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।  গোয়েন্দা সংস্থা অবশ্যই জানে সীমান্তের কোন পথ দিয়ে এগুলো প্রবেশ করে।

একশ্রেণীর সীমান্তরক্ষীর সহযোগিতা ছাড়া এসব মাদকদ্রব্য দেশে প্রবেশ করতে পারে না। আমাদের জানা মতে এসব অসাধু সীমান্তরক্ষীর বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

তাহলে কি ধরে নিতে হবে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে এ ধরণের অমানবিক অভিযান চালানো হচ্ছে বিরোধী দল ও জনগণকে ভয় দেখানোর জন্য ? জনগণ অবশ্যই মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে। তবে এটা স্বাধীন দেশ হিসেবে যেখানে আইন আছে, আদালত আছে নিরপেক্ষভাবে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হোক। দরকার হলে আরো কঠোর আইন করে প্রয়োজন হলে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিচার করা হোক।

কিন্তু একটা স্বাধীন দেশের আল্লাহর সৃষ্টি মানুষকে বিনাবিচারে হত্যা করা অমানবিক এবং বর্বরতার পরিচয়। এর ফল কোনদিন শুভ হয় না। এইভাবে মাদকদ্রব্য নির্মূল হবে বলে মনে হয় না।

সরকারকে জনগণ যাতে মাদকের বিরুদ্ধে সচেদন হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সমাজের বিভিন্ন  স্তরে মাদকের কুফল সম্পর্কে জনগণ বিশেষ করে যুব সমাজ সাবধান হতে পারে তার জন্য প্রচার প্রচারণার ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকের বিরুদ্ধে শিক্ষা দিতে হবে। সমাজ বিজ্ঞানীদের বলা হয় সমাজের ডাক্তার। রাষ্ট্রের উচিত সমাজ বিজ্ঞানীদের ডেকে তাদের উপদেশ নেয়ার। এটা কিভাবে নির্মূল করা যায়।

আমি নিজেও ২০ বছল আগে একটি লেখনির মাধ্যমে স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকায় আমাদের সমাজে কিভাবে মারাত্মক মাদকদ্রব্য যেমন- হেরোইন, প্যাথেডিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজাসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংশ করছে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত তার ইঙ্গিতও করেছিলাম। আরো অনেক বিবেকবান ব্যক্তি লেখনির মাধ্যমে সতর্ক করেছিলেন।

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যায় আমেরিকাতেও এক সময় মাদকের ভয়াবহতা দেখা দিয়েছিল। তখনকার আমেরিকার সরকার নামকরা সমাজ বিজ্ঞানীদের ডেকে তাদের উপদেশ নিয়েছিলেন কিভাবে এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তখন আমেরিকার সরকার ৩ শথ কোটি ডলারের একটি পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে মাদক সেবন করলে শরীলের হার্ট, রক্তে, মস্তিস্কের কি বিরুপ প্রতিক্রিয়া হয় তা ভিডিও করে আমেরিকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে দেখানো হয়। তার উপকারও আমেরিকা পেয়েছিল। বিবেকবান মানুষের সরকারের প্রতি আহবান আল্লাহর সৃষ্টি মানুষকে বিনাবিচারে এভাবে হত্যা না করে পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার এই মাদকের প্রভাব থেকে যুব সমাজ মুক্ত হতে পারে তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে আমাদের সকলকেই একদিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, কলামিষ্ট।


     এই বিভাগের আরো খবর