,

বিলুপ্তির পথে জাতীয় পাখি দোয়েল!

এক সময়ে ঝালকাঠির গ্রাম-গঞ্জের মাঠে-ঘাটে, বনে জঙ্গলে, গাছে গাছে জাতীয় পাখি দোয়েলসহ নানা ধরনের পাখি দেখা গেলেও কালের আবর্তে এখন আর চিরচেনা সেই পাখি দেখা যায়না। পাখির কলরবে মুখর গ্রামের মেঠোপথ এখন পাখি শূন্য হতে চলছে। বনে-জঙ্গলে, গাছে পাখি দেখার সেই অপরূপ দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। দুরবিন ব্যবহার করেও দুষ্কর হয়ে পড়েছে পাখি দেখা।

বনাঞ্চলের পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, জমিতে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, পাখির বিচরণ ক্ষেত্র ও খাদ্য সংকট আর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বিলুপ্তির পথে দোয়েলসহ দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখি।

কাঁঠালিয়ায় দক্ষিণ চেঁচরী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব মো. রেজাউল করিম বলেন, কয়েকবছর আগেও মানুষের ঘুম ভাঙ্গতো পাখির ডাকে। তখন বোঝা যেত ভোর হয়েছে। পাখির কলকাকলিই বলে দিত এখন সকাল। শুরু হোক দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা। কিন্তু এখন যেন পাখির ডাক হারিয়ে গেছে। এখন গাছ-গাছালিতে পাখির ডাক নেই।

মো. কামাল হোসেন হাওলাদার বলেন, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত সেসব পাখিগুলোর ডাক ও সুর মানুষকে মুগ্ধ করতো সেই পাখিই ক্রমান্বয়ই হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে দোয়েল পাখির এখন আর দেখাই মিলছে না।

কয়েকজন বয়স্কদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দোয়েল, ময়না, কোকিল, শালিক, চড়ইসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির পাখি গ্রামাঞ্চলের বিলে-ঝিলে, ঝোপে-ঝাড়ে, গাছের ডালে, বাগানে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনার ডালে বসে তার সুরের ধ্বনিতে মুগ্ধ করতো। এই পাখির কিচির-মিচির শীষ দেয়া শব্দ এখন আর কানে শোনা যায় না। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় বাঁশ গাছে, আমের ডালে, সজিনা গাছে, বাড়ির ছাদে যে পাখি সব সময় দেখা যেত সেই পাখি এখন আর চোখে পড়ে না।

পাখি পালন মোঃ জলিল খান বলেন, দোয়েলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্ম ওই পাখি দেখতে পান না, তাছাড়া শিকারীদের দৌরাত্ম্যের কারণে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে বনাঞ্চল। তাই বাধ্য হয়ে বাড়িতে বসেই বেশ কিছু প্রজাতির পাখি পালন করেছি। যাতে করে নতুন প্রজন্ম পাখি সম্পর্কে জানতে পারে।

তবে কম সংখ্যক টিয়া, ঘুঘু, কাক, মাছরাঙ্গা, ইত্যাদি পাখি শহর, গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেলেও জাতীয় পাখি দোয়েল তেমন আর মানুষের চোখে পড়েনা। তাই পাখি প্রিয় অনেক সৌখিন মানুষ বাড়ির খাঁচায় বন্ধী করে পাখি পালন করতে দেখা যায়। এমন এক পাখি পালনকারী বলেন, দোয়েলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

সচেতন মহল মনে করেছেন, নদী ভাঙ্গনের ফলে ফসলি জমিতে উঠছে ঘরবাড়ি। তাছাড়া জনসংখ্যা প্রভাবেও কোথাও না কোথাও প্রতিদিন নতুন নতুন ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে। এতে গাছ কেটে বন উজাড় করে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। তাই আগের মতো বনে জঙ্গলে তেমন পাখির দেখা মিলছে না।

তাই আগের মতো বনে জঙ্গলে তেমন পাখির দেখা মিলছে না। মো. জাকির হোসেন বলেন, জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পাখি মরে যাচ্ছে, আবার খাদ্য সংকট ও আবাসস্থল কমে যাওয়ায় পাখি বংশ বিস্তার করতে পারছে না, এতে কমে যাচ্ছে পাখি। তাই পরিবেশ রক্ষা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

এছাড়া মুনাফার আশায় বনে চোরা শিকারীরা বিভিন্ন ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে শিকারের হাত থেকে বাঁচতে জীবন রক্ষার্থে পাখিরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। অনেক সময় তাদের হাতে মারাও যাচ্ছে পাখি। অথচ প্রশাসনের তেমন কোন তৎপরতা নেই।

এ বিষয়ে কাঁঠালিয়া উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, শীত মৌসুমে পাখি শিকারের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকে। এছাড়া অন্য সময় তেমন শিকার হয় না। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী ও পশু পাখি আবাসস্থলে সামান্য খাদ্যের সংকট থাকলেও উপকূলের বন রক্ষায় বন বিভাগ তৎপর রয়েছে। বন রক্ষা হলে পশু-পাখি, বন্যপ্রাণীও রক্ষা হবে।

এ বিষয়টি মাথায় রেখেই মাঝে মধ্যেই পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সহযোগিতা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে, কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণসহ, উপকুলের বন ও পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে জাতীয় পাখি দোয়েলসহ দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখির দেখা মিলবে না বলে মনে করেছেন পরিবেশবাদীরা।


     এই বিভাগের আরো খবর