,

বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমন – ডা: সুরেশ তুলসান

পর্ব-১

“মামুদ মিয়াঁ বেকার,তাই বলে কি শখ নেই তার বিশ্ব ঘুরে দেখার। আসলে পরে চেকার মামুদ মিয়াঁ হেঁসে বলেন ট্রেন কি তোমার একার।”এটা কোন হেঁয়ালী মার্কা ছড়া না। এটা আমাদের দেশের স্কুলের ছোটদের পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত একটি কবিতা। তাই বলে আমাদের দেশে আপামর জনসাধারনের বড় একটা অংশের বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমনের মানসিকতার জন্য আমি এই কবিতাটিকে সম্পুর্ন দোষারোপ করছি না। কেননা এই কবিতাটি আমাদের পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমরা বাঙালীরা বিনা টিকিটে ট্রেনে চেপেছি। অন্য মানুষকে দোষারোপ করার আগে আমার নিজের ছাত্র জীবনের কিছু কথা আগে বলি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় প্রায় প্রতি সপ্তাহে বাড়ী যেতাম হোম সিকনেস এর কারনে। স্বভাবত প্রায়শ বিনা টিকিটে এবং ক্লাসমেট, জুনিয়র, সিনিয়র মিলে সদলবলে। সিনিয়র দের অনেকে এবং আমাদের কেউ কেউ টিকিট কাটলেও কিছু কিছু গ্রুপ ছিলো যারা কস্মিনকালেও টিকিট কাটতো না। অথচ আমাদের সময়েতো এই কবিতাটি আমাদের পাঠ্যবইতে ছিল না। সুতরাং এই দুর্মুখ কবিতাটি না পড়েই আমরা বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া শিখেছিলাম। তবে আমার এই বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া, এই বিদ্যার যিনি বিদ্যাগুরু তার নাম ছিল নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাস। আমরা নীলকান্ত বলে ডাকতাম। এটা ছিল ওর ডাকনাম। সে ও আমাদের সাথেই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। তবে সে পড়াশুনায় আমার চেয়ে তুলনামূলক ভালো হওয়ায় ওর ভর্তির সুযোগ হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। ও একটা কথা প্রায়ই বলতো, বিনা টিকিটে ট্রেনে, বাসে,লঞ্চে,ফেরীতে সব কিছুতেই চড়লাম কিন্তু প্লেনে বিনা টিকিটে উঠতে পারলাম না। ওখানে যে টিকিট না করলে ভিতরে ঢুকতেই দেয় না। ভিতরে ঢুকে প্লেন ছাড়ার পর টিকিট চেক করার ব্যবস্থা থাকলে প্লেনেও বিনা টিকিটে চড়তাম। একটা কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা, একজন যাত্রী বিনা টিকিটে প্লেনে চড়ে দুবাই যাওয়ার উদ্দেশ্যে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুবাইগামী একটি ফ্লাইটের চাকায় উঠে পড়েছিলেন। বিমানটি দুবাই বিমানবন্দরে অবতরন করার সময় তার মৃতদেহটি রানওয়েতে ছিটকে পরে। পরিণতি একটি করুন মৃত্যু আর দেশের সুনামের ভুলুন্ঠন। তবে এই ঘটনায় আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।
বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য ফরম তোলা, ফরম জমা দেওয়া,ভর্তি পরীক্ষা ইত্যাদির জন্য একসাথে দলবেঁধে দৌড়াদৌড়ি করার সময়েই আসলে বিনাটিকেট এ ট্রেনে ভ্রমন বিদ্যার হাতে-খড়ি। প্রতিনিয়ত যাতায়াতের কারনে টিটি সাহেবদের অনেকেই পরিচিত হয়ে গিয়ে ছিলেন। টিকিট চাইতেন ঠিকই তবে না পেয়ে মৃদু ভর্ৎসনা করতেন, বকাঝকা করতেন। তবে এর বেশী ঝামেলা কেউ কখনও করতেন না। কেউ কেউ টিকিট চাইতেনই না কখনও, জানতেন চাইলে টিকিটতো পাবেনই না উল্টা কোন কোন বাঁন্দর মার্কা ছাত্র দুচার টাকা হাতখরচ চেয়ে বসতে পারে । তবে কেউ কেউ একটু আধটু আদরও করতেন মেডিকেলে পড়ুয়া ছোট ছোট বাচ্চা মানুষগুলো একসময়ে বড় বড় ডাক্তার হবে এই ভেবে হয়তো। আমাদের সাথে যারা একটু আধটু বখাটে টাইপের ছিল তারা তারা তো রীতিমত সমীহ পেত টিটি সাহেবদের কাছ থেকে। কারন আরও অন্যান্ন বিনা টিকিটের যাত্রী, ভারতীয় শাড়ি কাপড় বা অন্যান্ন মালামাল বহনকারী কালোবাজারি যাত্রীরা আমাদের চোখের সামনেই যে পদ্ধতিতে সবকিছু ম্যানেজ করে একই ট্রেনে চলাচল করতো সে সম্পর্কে আমরা সম্পুর্ণ অবগত ছিলাম। একবারের কথা বলি রাজশাহী স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন পার হওয়ার কিছু পরেই ভালো টিটিদের একজনের হাতে ধরা খেলাম। সপ্তাহান্ত না হওয়ার কারনে একাই ছিলাম। সেদিন একটু খারাপ আচরনই করলেন তিনি যেটা সাধারণত তিনি করেন না। আস্তে করে কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন ঈশ্বরদীতে মোবাইল কোর্ট আছে। ধরা পড়লে ঠেলা বুঝবে। ভয়ে ভয়ে বসেছিলাম। না জানি আজ কত বড় বিপদের মধ্যে পড়ি। ছোট বেলা তো, তাই মান ইজ্জতের ভয় তখনও তৈরি হয়নি। আব্দুলপুর জংশনে ট্রেন থামার কিছুক্ষন পরে যা ঘটলো তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সেই ভালো টিটি সাহেব হঠাৎই আমার হাতে একটা কিছু গুঁজে দিলেন। দেখলাম একটা টিকিট, আব্দুলপুর জংশন থেকে পোড়াদহ জংশন। আমি এতোটাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম যে উনাকে কোন রকম ধন্যবাদ দেয়া তো দুরের কথা, আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দই বের হলো না। আমাদের সেই যুগে কোন মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য কথায় কথায় সাহেবি কায়দায় থ্যাংকস দেওয়ার রেয়াজ ছিলো না। কৃতজ্ঞতা মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে প্রকাশ করা লাগতো যা ছিলো আর্টিফিশিয়াল থ্যাংকস দেয়ার চাইতে অনেক বেশী কঠিন। টিটি সাহেব দের বুক পকেটে যদিও উনাদের নাম লেখা নেমপ্লেট থাকে, আজ এতোদিন পর উনার নাম আমার আর মনে নেই। এও জানি না তিনি বেঁচে আছেন কিনা ? অনেকদিন ট্রেনে উঠিনা। এখন বড় হয়েছি, বিনা টিকিটে তো ট্রেনে উঠার প্রশ্নই উঠে না। এই সেদিন ঢাকা থেকে সপরিবারে ট্রেনে বাড়ী ফেরার পথে টিটি সাহেব দের সাথে বেশ কিছু বিনা টিকিটের যাত্রী দের বচসা, দর-দাম, দফা – রফা ইত্যাদি দেখে নষ্টালজিয়ায় পেয়ে বসেছিল, সাথে কিছুটা অপরাধ বোধ। তাই ট্রেনে বসেই লেখাটির শুরু। বিনা টিকিটে ট্রেনে যাতায়াত আমাদের একটি চিরায়ত সংস্কৃতি। এই কবিতাটি ছাড়াও বেশ কিছু সিনেমা, উপন্যাস, গল্পে এটা দেখা যায়। এই সংস্কৃতি অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে ভবিষ্যৎ এ ও থাকবে। যদি না রেল ব্যবস্থাপনার আমুল পরিবর্তন এবং দেশের আম জনতার নৈতিকতার পরিবর্তন ঘটে।


     এই বিভাগের আরো খবর