,

সম্মিলিতভাবেই পরিত্রাণ খুঁজিতে হইবে

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফুঁসিয়া উঠা অভূতপূর্ব ছাত্রবিক্ষোভে পুরো দেশ যখন তোলপাড় হইতেছে, তখনো থামিয়া নাই মৃত্যুর মিছিল। আশা করা গিয়াছিল যে, চালক-মালিক ও পথচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই সতর্ক ও সংযত হইবেন। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য যে, সপ্তাহব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভের কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে যান চলাচল যখন একেবারেই সীমিত ছিল, সেই অবস্থায়ও মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বেশকিছু দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ হতাহত হইয়াছে। তন্মধ্যে রহিয়াছে কমপক্ষে ৪ জন শিক্ষার্থীও। রাজধানীর মগবাজারে বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় নিহত হইয়াছেন একজন মোটরসাইকেল আরোহী। সব চাইতে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটিয়াছে ধামরাইয়ে। দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মারা গিয়াছেন ৫ জন। আহত ৩০ জনের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীয়তপুরে গাছের সহিত সংঘর্ষে নিহত হইয়াছেন একজন টমটম চালক। শেরপুরে মোটরসাইকেল ও ট্রলির সংঘর্ষে হতাহত হইয়াছেন দুইজন। আর কুমিল্লার চান্দিনায় চলন্ত বাস আইল্যান্ডে উঠিয়া গেলে আহত হয় ২০ যাত্রী। জানা যায়, চালক সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিতে গিয়া গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ফেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটিয়াছে চালকের বেপরোয়া ও দায়িত্বহীন মানসিকতার কারণে। উদাহরণ হিসাবে মগবাজারের ঘটনাটির উল্লেখ করা যায়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা একবাক্যে বলিয়াছেন যে, হতভাগ্য মোটরসাইকেল চালককে চাপা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসটি থামানো হইলে তাহাকে বাঁচানো যাইত। কিন্তু তাহা না করিয়া চালক চাপা দেওয়া অবস্থায় তাহাকে সুদ্ধ গাড়ি চালাইয়া যায় এবং গাড়ি চালু রাখিয়া আরও কিছু যানবাহনকে চাপা দিয়া পালাইয়া যাওয়ার চেষ্টা করে। ইহা যে মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো চিত্র নহে—তাহা সংশ্লিষ্ট সকলেই জানেন।

 

অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্যই যে মূলত বিশৃঙ্খলা ও চালকের বেপরোয়া মানসিকতাই দায়ী— বিভিন্ন গবেষণায়ও তাহার জোরালো প্রমাণ রহিয়াছে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্যের যে ভয়াবহ ছবিটি আমাদের সম্মুখে রহিয়াছে— তাহাও সর্বব্যাপী এই অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, বিশৃঙ্খলা এক সর্বগ্রাসী ব্যাধি হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে আমাদের জাতীয় জীবনে। আইন না মানা, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা এবং কারণে-অকারণে সীমালঙ্ঘন করাটাই যেন পরিণত হইয়াছে স্বাভাবিক নিয়মে। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নূতন পরিবহন আইনের খসড়া চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হইয়াছে। আইন যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু সকলের সম্মিলিত সদিচ্ছা থাকিলে বিদ্যমান আইন দিয়াও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা একেবারে অসম্ভব ছিল না। কিন্তু আইন বাস্তবায়ন করিবার দায়িত্ব যাহাদের— তাহারাও এই বিশৃঙ্খলার ব্যাধি হইতে মুক্ত নহে। এই ব্যাপারে বিশদ বলিবার প্রয়োজন নাই। সড়ক-মহাসড়কে যে নৈরাজ্য চলিতেছে তাহা যেমন একদিনে গড়িয়া উঠে নাই, তেমনি ইহার জন্য এককভাবে কাহাকেও দায়ী করিবার অবকাশও নাই বলিলেই চলে। সড়কে-মহাসড়কে যে মৃত্যুর উত্সব চলিতেছে—তাহা আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও অসচেতনতারই বহিঃপ্রকাশ বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। অতএব, ধৈর্যের সহিত সম্মিলিতভাবেই এই সমস্যা হইতে পরিত্রাণ খুঁজিতে হইবে।


     এই বিভাগের আরো খবর