,

সবার কথা ভাবা দরকার

বাংলাদেশে মূলত নব্বই দশক হইতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণে এইসকল প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতেছে। বাধ্যতামূলক ও সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন, মাধ্যমিকে নারী শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, বিনামূল্যে বই বিতরণ প্রভৃতি উদ্যোগের কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে জাগরণের সৃষ্টি হয়। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়িতে থাকে, যাহাদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়ায়। এইজন্য উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি ছিল। কিন্তু গত প্রায় দুই দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িলেও শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, গবেষণা, স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়িয়া তোলা ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে ঘাটতি রহিয়া গিয়াছে। এখনও এই রকম অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নাই। স্থায়ী শিক্ষকের হারও সন্তোষজনক নহে।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির এক নূতন সমস্যা হইল, এইসকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ঝরিয়া পড়িবার হার বাড়িতেছে। আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ঝরিয়া পড়া শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আজ অনেক সচেতন। কিন্তু উচ্চ শিক্ষা হইতে যেসকল শিক্ষার্থী ঝরিয়া পড়িতেছে তাহাদের ব্যাপারে উদাসীন। সমপ্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ঝরিয়া পড়া শিক্ষার্থীদের লইয়া গবেষণা করিয়াছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। তাহার গবেষণা বলিতেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ঝরিয়া পড়া শিক্ষার্থীর হার ১০-১৫ শতাংশ। গবেষণাটির শিরোনাম—‘ফ্যাক্টরস ইনফ্লুয়েন্সিং অন ড্রপআউটস অ্যাট আন্ডারগ্র্যাজুয়েটস লেভেল ইন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ : এ কেস স্টাডি’। ইহার মোদ্দাকথা হইল, এইসকল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি বেশি হওয়ায় এবং প্রতি বত্সর তাহা অযৌক্তিক হারে বৃদ্ধির কারণে অনেকে শুরুতে বা মাঝে আর লেখাপড়া চালাইয়া যাইতে পারিতেছে না। এই হার ৩১ শতাংশ। আবার একাডেমিক চাপ নিতে না পারায় ও ইংরেজি বিষয়ে দুর্বলতার কারণে ঝরিয়া পড়িতেছে যথাক্রমে ৫৭ ও ৩২ শতাংশ। কিছু শিক্ষার্থী ক্রেডিট ট্রান্সফার করিয়াও চলিয়া যাইতেছে বিদেশে। আবার চাকুরি পাওয়ার কারণেও অনেকে মাঝপথে পড়ালেখা বন্ধ করিয়া দিতেছে।
যাহারা ক্রেডিট ট্রান্সফার করিয়া চলিয়া যাইতেছে তাহাদের ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নাই। কিন্তু যেসকল শিক্ষার্থী একাডেমিক ও আর্থিক চাপ সামলাইতে না পারিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে, তাহাদের কথা অবশ্যই ভাবা দরকার। এইক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় যথাসম্ভব কমাইয়া শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি হ্রাস করিতে পারে। পাশাপাশি প্রতি বত্সর ফি না বাড়াইয়া পাঁচ বত্সর অন্তর যৌক্তিক হারে বাড়াইতে পারে। দ্বিতীয়ত, অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বাড়ানো, শিক্ষাঋণ বিতরণ ও ক্যাম্পাসেই তাহাদের জন্য খণ্ডকালীন চাকুরির ব্যবস্থা করা যাইতে পারে। তৃতীয়ত, যেহেতু এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সর্বাধিক সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করিতেছে, তাই এখানে সরকার ভবননির্মাণসহ নানা ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা করিতে পারে কিনা তাহা চিন্তা করিয়া দেখা যায়— যাহাতে ইহার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে টিউশন ফির ওপর। অন্যদিকে একাডেমিক চাপ কমানো ও ইংরেজিতে দুর্বলদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার ব্যবস্থা করা যাইতে পারে।


     এই বিভাগের আরো খবর