,

মিরপুর-ভেড়ামারায় আওয়ামী লীগ-জাসদ বিরোধ তুঙ্গে

কুষ্টিয়া- কুষ্টিয়ার-২(মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ-জাসদ বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এ আসনে মহাজোটের অন্যতম প্রধান এই দুই শরিকের বিরোধ বহু পুরণো হলেও সম্প্রতি এর মাত্রা বেড়েছে বহুগুনে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে কথার লড়াই। চলছে একে অপরের ওপর বিশোদগার। তবে সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই যেন বাড়ছে তীক্ততা। শেষ মেষ কথার লড়াই থেকে তা সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে এমন আশংকা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। গতকাল শনিবার বিকেলে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা বাস স্ট্যান্ডে পৌর আওয়ামী লীগের আয়োজনে জেল হত্যা দিবস পালিত হয়। তাতে প্রায় কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশগ্রহন করে। ভেড়ামারা পৌর আওয়ামী লীগের আয়োজনে জনসভার আয়োজন থাকলেও পাশর্^বর্তী মিরপুর উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীও যোগদান করেন জনসভায়। মুলত: জেল হত্যা দিবস নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও গোটা জনসভায় তুলোধোনা করা হয় জাসদ ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে। জেল হত্যা দিবস পরিনত হয় বিক্ষোভ সমাবেশে। প্রায় ১৫জনেরও বেশি নেতা বক্তব্যের সুযোগ পেলেও তাদের সূর একই। তাদের চোখে মুখে ক্ষোভের বহির্প্রকাশ। জোটের শরিক হলেও জাসদ ও জাসদের সভাপতি ওই আসনের সংসদ সদস্য তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করেন বলেও বিস্তর অভিযোগ তোলেন নেতাকর্মীরা। পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা কামাল মুকুলের সভাপতিত্বে শুরু হয় জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে জনসভা। প্রত্যেকের কন্ঠেই জাসদ ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে আওয়ামী লীগের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাহিরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদ তার বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী ইনুকে বেঈমান মুনাফিক আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইনুকে মিরপুর-ভেড়ামারা আসনে এমপি বানিয়েছিলেন এলাকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য। কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন না ঘটিয়ে তিনি নিজের এবং কুষ্টিয়া জেলা জাসদ’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম স্বপনের পরিবর্তন ঘটান। দাউদ বলেন ভেড়ামারায় আওয়ামী লীগের ওপর জাসদ স্থানীয় জামায়াত বিএনপি নেতাকর্মী দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে। জাসদের এখন শক্তি বিএনপি-জামায়াত। কিন্তু সেই শক্তি আর থাকবেনা। তাই আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাকে(ইনু) ভাসিয়ে ভেড়ামারা থেকে বিতাড়িত করা হবে বলেও ঘোষণা দেন। বক্তব্য রাখেন ভেড়ামারা উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য এ্যাড. সাইফুল ইসলাম রানা ও তার ভাই ভেড়ামারা পৌর মেয়র শামীমুল ইসলাম ছানাও। তাদের বক্তব্যেও একই সূর। এ্যাড. রানা তথ্যমন্ত্রী ইনুকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন আপনি নৌকা ছাড়া মশাল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন কিভাবে জিততে পারেন দেখব। একই সাথে আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রার্থী দেয়ার কথাও জানান তিনি।
ভেড়ামারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ভেড়ামারা পৌর মেয়র শামীমুল ইসলাম ছানা বলেন মিরপুর-ভেড়ামারার মাটি ও মানুষের নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করেছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে এক জরিপে সারা দেশে গুটিকয়েক আসনে আওয়ামী লীগ জয়ি হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছিল তার মধ্যে মিরপুর-ভেড়ামারা আসন ছিল। কিন্তু জোটগত কারনে হাসানুল হক ইনুকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। ওই নির্বাচনে হাসানুল হক ইনু তার প্রতীক বদল করে নৌকায় চড়ে জয়লাভ করলেও এলাকার মানুষের উন্নয়নে ভুমিকা রাখেননি। জোট তথা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে সম্পর্ক রাখেননি। তাই আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটানো হবে বলেও তিনি স্পষ্টভাষায় বলেন।
কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন বিগত ১০ বছর ইনু সাহেব আওয়ামী লীগের জমিতে ফসল ফলিয়েছেন। তাতে কি ফসল ফলেছে তা দৃশ্যমান। এবার আপনার জমিতে নিজে আবাদ করে দেখুন কেমন ফসল হয়। বুঝবেন ফসল উৎপাদনের কেমন জ¦ালা। রবিউল হাসানুল হক ইনুকে উদ্দেশ্য করে বলেন এ আসনে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিজ জমিতে ফসল ফলাবে। তাই আপনি আপনার জমিতে ফসল ফলাবেন। দেখব কার জমিতে কেমন ফসল হয়।
মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন তাঁর বক্তব্যে বলেন মিরপুর ভেড়ামারায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জাসদের জিম্মিদশায় পড়েছে। এথেকে বের হতে না পারলে জাসদ গণবাহিনী ও ঈগল বাহিনীর জিম্মি দশায় পড়ব। এই জিম্মি দশা থেকে আমরা বের হতে চাই। তিনি আপসোস করে বলেন ১৯৭৫ সালের পর আমরা কখনোই এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য পায়নি। কখনো বিএনপি, কখনো বা অন্য দল আবার কখনো পরগাছা আমাদের ওপর ভর করে শোষণ শাসন করেছে। আমাদের রক্ত চুষে খেয়ে উনাদের চেহারা চকচকে করে ফেলেছেন। আর সেই চকচকে চেহারায় বলেন আমাদের চল্লিশটি আসনে হারিয়ে দিবেন। ইনুকে উদ্দেশ্য করে কামারুল বলেন জীবনের প্রথম থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যত নির্বাচন করেছেন সব ভোট যোগ করেও আপনি একবারও এমপি হতে পারবেননা। কামারুল বলেন চল্লিশটি আসনে হারানো তো দুরের কথা আপনার টোটাল ভোট কত তা জানা আছে। আপনি টোটাল ভোটের মালিক(সারাদেশে) ৬০-৭০হাজার। কামারুল আরো বলেন মিরপুর ভেড়ামারা আসনে যখন হানিফ সাহেবকে এমপি বানানোর জন্য এলাকার মানুষ বুক প্রাণ দিয়ে সংগঠনকে দাঁড় করিয়েছিল তখন ২৮ অক্টোবর হানিফ সাহেবকে আপনার নেতৃত্বে, চারদলীয় জোটের নেতত্বে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই সময় অন্যরা শহিদ হলেও হানিফ সাহেব বেঁচে ছিলেন। কারন আপনার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। আজ অবধি পর্যন্ত দুইবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমাকে বারবার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এত কিছুর পরও মাথা নুয়াইনি। আমরা জয়বাংলা, আল্লাহু আকবার বলে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি, পারলে মোকাবিলা করেন। কামারুল নিজেদের বাজপাখী দাবী করে জাসদকে হামড়ি তামড়ি না করার পরামর্শ দেন।
ভেড়ামারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান মিঠু ছাড়াও মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী জনসভায় উপস্থিত ছিলেন।


     এই বিভাগের আরো খবর